-->

লক্ষ্মীপূজা ব্রত ও ব্রতের ফললাভ | Laxmi Puja Brata Katha

লক্ষ্মীপূজা হলো হিন্দু ধর্মের একটি পূজা উৎসব যা দেবী লক্ষ্মী, ঐশ্বর্য্য, ধন, সমৃদ্ধি, ঐশ্বর্য্য, বিপন্নতা এবং শোভার প্রতীক হিসেবে পূজা হয়। এই পূজা হিন্দু বঙ্গবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উৎসবমূলক।

লক্ষ্মীপূজা বাংলা অক্টোবর-নভেম্বর মাসের অষ্টমী তিথিতে অথবা অষ্টমী তিথি পর্যন্ত উদযাপন হয়, এবং এটি দীপাবলি উৎসবের একটি অংশ হিসেবে পরিচিত। পূজা দিনে বাড়িগুলি ধানের পুকুরে বা পন্যদুকানে অথবা ব্যবসার স্থানে লক্ষ্মীপূজা হয়।


পূজার দিনে বড় বা ছোট লক্ষ্মীপুজা হয়, যার জন্য বিশেষভাবে লক্ষ্মী মূর্তি প্রতিষ্ঠান করা হয়। মূর্তির সামনে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পূজা পন্ডিত বা ব্রাহ্মণের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়। পূজার পর লক্ষ্মীদেবীর আগ্রহে বা ব্যবসা ও আর্থিক সফলতা বৃদ্ধির জন্য দেবীকে প্রদর্শন করা হয়। এরপর প্রদান করা হয় নতুন বস্তুগুলির প্রতি লক্ষ্মীদেবীর আশীর্বাদ চাওয়ার জন্য।


লক্ষ্মীপূজার দিনে বাড়িগুলি উজ্জ্বল আলোর দ্বারা প্রদীপিত হয়ে থাকে, এবং রাতে আকাশে অনেক দীপের আলো দেখা যায়। এ দিনে সামাজিক মিলন ও খাদ্যদানের অপরিহার্য অংশ হয়ে থাকে।

লক্ষ্মীপূজা ব্রত

ব্রতের সময় বা কাল-

ভাদ্র, অশ্বিন, কার্তিক, পৌষ ও চৈত্র মাসে বন্ধী পুজো হয়ে থাকে। তাছাড়া, মেয়েরা প্রত্যেক বৃহস্পতিবার ঘরে ঘরে লক্ষ্মী পুজো করে থাকে।


ব্রতের দ্রব্য ও বিধান-

সৃপ, দীপ, ফুল, চন্দন, নৈবেদ্য, ফল, মূল ও মিষ্টান্ন। এই পুজোয় ঘট বসানোর জায়গায় আলপনা দিতে হয়। আমাদের দেশের মেয়েরা ভার, আশ্বিন, কার্তিক, পৌষ ও চৈত্র মাসেও খুব ভক্তি সহকারে লক্ষ্মী পুজো করে থাকে, এছাড়া প্রত্যেক বৃহস্পতিবারও ঘরে ঘরে লক্ষ্মী পুজোর প্রচলন হয়ে আছে।


ব্রতকথা-

এক দেশে এক গরীব বিষবা ব্রাহ্মণী বাস করত। তার একটি মাত্র ছেলে ছিল, সংসারে তাদের বড় দুঃখ। ব্রাহ্মণী তার চরকায় সুতো কাটতে আর সেই সুতো বিক্রি করে যা পেত, তাইতেই কোনো রকমে তাদের খাওয়া পরা চলত। তাদের কুঁড়ের সামনে পুকুর পাড়ে একটা খুব বড়ো অশ্বথ গাছ ছিল। ব্রাহ্মণীর ছেলেটি খাওয়া দাওয়ার পর রোজ সেই গাছের তলায় বসে খেলত। একদিন ছেলেটি দেখল, একজন ক্ষীরওয়ালা ক্ষীর বিক্রি করতে সেই দিকে আসছে। ক্ষীর দেখে ছেলেটির ক্ষীর খাবার ইচ্ছে হল, কিন্তু ক্ষীর কেনবার পয়সা কোথায়। সে তখন ভীরওয়ালাকে দাঁড়াতে বলে তার মার কাছে ছুটে গিয়ে ক্ষীর কেনবার জন্যে পয়সা চাইল। মা বা পয়সা পারে কোথায়, তবু অনেক খুঁজে পেতে সুতো কাটার চুপড়ির ভেতরে চায় কড়া কড়ি পেল। মা তাই ছেলেটি দিল, ছেলেটি তখন আবার দৌড়ে ক্ষীরওয়ালার কাছে গিয়ে সেই চার কড়া কড়ি দিয়ে তাকে ক্ষীর দিতে বলল। ক্ষীরওয়ালা ছেলেটাকে দেখে কেমন যেন দয়া হল। সে কিছু না বলে এক ভাড় ক্ষীর তাকে দিয়ে চলে গেল। ছেলেটি স্কীর খাবার জন্যে অশ্বথ গাছের তলায় গিয়ে বসল। সেই অশ্বথ গাছের ওপর এক পেঁচা-পেচার বাসা ছিল। তারা তাদের দু'টি ছানাকে বাসায় রেখে চরতে বেরিয়েছিল। এদিকে তাদের ছানা দুটো ক্ষিদের জ্বালায় চেঁচাচ্ছিল। ছেলেটি পীর মুখে তুলতে গিয়ে তাদের কান্না শুনতে পেয়ে ভাবল, আহা ছানা দুটোর নিশ্চয় ক্ষিদে পেয়েছে। এই কথা মনে হতে সে গাছে উঠে ছানা দুটোকে পেড়ে এনে বেশ খানিকটা ক্ষীর তাদের খাইয়ে দিয়ে আবার তাদের বাসায় তুলে দিয়ে এল।

সন্ধ্যের সময় পেঁচা-পেয়ী তাদের বাসায় ফিরে এসে দেখল যে, ছানারা বেশ চুপচাপ রয়েছে। পেয়ী তখন বলল, "কীরে। তোরা চুপ করে রয়েছিস যে? তোদের ক্ষিদে পায়নি?" তখন তারা তাদের মাকে বলল যে ওই গরীব ব্রাহ্মণীর ছেলে আজ আমাদের খুব ক্ষীর খাইয়েছে, তাই আজ আমাদের ক্ষিদে নেই। ছানারা আরও বলল, "মা! এই ছেলেটি খুব গরীব, সে অনেক কষ্টে ক্ষীর পেয়েছিল তবু তাই থেকেই আমাদের খাইয়েছে। ওদের উপকার তোমাকে করতেই হবে।" পেঁচী বলল, "বেশ! ওদের যাতে আর দুঃখ না থাকে তার ব্যবস্থা আমি নিশ্চয়ই করব। এবার যখন ছেলেটি খেলতে আসবে তখন তোরা তাকে বলবি, ভোরে এখানে আসতে, তাহলেই হবে।" পরের দিন ছেলেটি আবার বিকেলে যখন খেলতে এল তখন পেঁচা-পেঁচীর ছানা দুটো তাকে ভোরে আসতে বলে দিল।

পেঁচা-পেঁচীর ছানাদের কথামত, পরের দিন ছেলেটি ঠিক ভোরে এসে উপস্থিত হল। ছেলেটিকে দেখে পেঁচা-পেঁচী তাকে ডেকে বলল, "দ্যাখো বাছা! তুমি আমাদের ছানাদের খাইয়ে আমাদের খুব উপকার করেছ। তাই আমরাও তোমার উপকার করতে চাই। তোমাকে আজ আমরা এক জায়গায় নিয়ে যাব, সেখানে অনেক ধনরত্ন দেখতে পাবে আর সেই ধনরত্ন তারা তোমাকে দিতেও চাইবে, কিন্তু তুমি বলো যে ধনরত্ন আমার কিছু চাই না-আমি শুধু তিলধুবড়ী চাই। এখন আমার পিঠের ওপর উঠে চোখ বুজে বসে থাকো।" ছেলেটি তখন পেঁচীর পিঠের ওপর বসে চোখ বুজে রইল। পেঁচী তখন তাকে নিয়ে উড়তে উড়তে স্বর্গে লক্ষ্মী-নারায়ণের কাছে গিয়ে হাজির হল। পেঁচী এইবার তাকে চোখ খুলতে বলল। ছেলেটি চোখ খুলতেই দেখল একটি সোনার সিংহাসনে লক্ষ্মী-নারায়ণ বসে আছেন। সে তখনি মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তাঁদের প্রণাম করল। লক্ষ্মী তখন বললেন, "বাছা! তুমি কে, কোথায় থাকো, এখানে কেন এসেছো আর কী চাও তুমি?" ছেলেটি তখন বলল, "মা! আমরা বড়ো গরীব। আমাদের দুঃখ ঘুচিয়ে দাও মা।” লক্ষ্মী তখন তাকে স্বর্গের ধন ভাণ্ডারে নিয়ে গেলেন আর তার যা যা নিতে ইচ্ছে হয় নিতে বললেন। ছেলেটি বলল "না মা, আমি এসব কিছু নিতে চাই না, আমায় তিলধুবড়ী দাও মা।” লক্ষ্মী তখন হেসে বললেন, "আচ্ছা এই নাও তিলধুবড়ী। একে রোজ খুব ভক্তি করে পুজো করবে-তাহলেই তোমাদের আর কোনো দুঃখ থাকবে না।"

ছেলেটি আবার লক্ষ্মী-নারায়ণকে প্রণাম করে পেঁচীর পিঠে চড়ে চোখ বুজে বসল। পেঁচীও অল্প সময়ের মধ্যে তাকে সেই অশ্বত্থ গাছের তলায় এনে নামিয়ে দিল। ছেলেটি তখনই ছুটে বাড়িতে গিয়ে তার মাকে সব কথা জানাল। ব্রাহ্মণী দেখল তার পরের দিনই ভাদ্র মাসের বৃহস্পতিবার, সে আর কালবিলম্ব না করে লক্ষ্মী পুজোর আয়োজন করল। সকালবেলায় স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ব্রাহ্মণী খুব ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিলধুবড়ীর পুজো করল। এর পরই তাদের ওপর মা লক্ষ্মীর দয়া হল। তাদের কুঁড়ে ঘরের জায়গায় সুন্দর কোঠা দালান হল। জমি-জমা, পুকুর, মাছ, ধনরত্ন দাস-দাসীতে ভরে গেল তাদের বাড়ি। তাদের আর কোনো দুঃখ রইল না। এদের এই রকম অবস্থা বদলে যাওয়ার খবর পেয়ে দেশের রাজা ভাবলেন যে, তারা কী করে এতো ধন-ঐশ্বর্য্য পেলে? নিশ্চয় কোথাও ডাকাতি করে এইসব করেছে। রাজা তখন তাদের বাড়িতে লোক পাঠিয়ে তাদের সব জিনিসপত্র লুট পাট করে নিয়ে গেলেন। এই সঙ্গে লক্ষ্মীর তিলধুবড়ীও রাজার বাড়িতে চলে গেল; কিন্তু সেটা রাজার বাড়িতে রইল না আবার ফিরে গেল লক্ষ্মীর কাছে, কারণ লক্ষ্মী সেটা রাজাকে দেননি। এদিকে তিলধুবড়ী চলে যাওয়ার ফলে, ব্রাহ্মণীর আবার আগেকার মতো অবস্থা আরম্ভ হল-তার চরকায় সুতো কাটা।


ছেলেটি কিন্তু আবার রোজ গিয়ে সেই অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে কান্নাকাটি করতে লাগল। তখন পেঁচা-পেঁচীর আবার দয়া হল। পেঁচী আবার ছেলেটিকে পিঠে করে মা লক্ষ্মীর কাছে নিয়ে গেল। মা লক্ষ্মী ছেলেটিকে বললেন, "আমি আগেই সব জেনেছি। এই নাও তিলধুবড়ী আবার তোমাকে দিলাম। এবার খুব সাবধানে রেখে এর পুজো করো। এবার হারালে আর পাবে না।" ছেলেটি মা লক্ষ্মীকে প্রণাম করে তিলধুবড়ী নিয়ে পেঁচীর পিঠে চড়ে ফিরে এল। তারপর ব্রাহ্মণী আবার খুব যত্ন ও ভক্তি করে তিলধুড়ীর পুজো করল, তাদের আগেকার মত ঐশ্বর্যা আবার ফিরে এল। রাজা এবারে তাদের ঐশ্বর্য্য হয়েছে দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তিনি আর দেরি না করে ব্রহ্মণীর ছেলেটির সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিয়ে দিলেন। ব্রাহ্মণীর তখন আর আনন্দ ধরে না। এইভাবে বেশ কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর স্বর্গ থেকে ব্রাহ্মণীর ডাক এল। ব্রাহ্মণী তখন ছেলে-বউকে কাছে ডেকে বলল, "বৌমা! আমি এবার চলে যাচ্ছি, শুনে রাখো, ভাদ্র, কার্তিক, পৌষ আর চৈত্র মাসে খুব ভক্তি করে লক্ষ্মীর পুজো করবে। আর তিলধুবড়ীর পুজো রোজ করবে। ছড়া ঝাঁট, গঙ্গা জল আর ধূপ-ধুনো দিতে কোনো দিন ভুলো না। তাহলে এই বংশে কখনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না।” এই বলে ব্রাহ্মণী স্বর্গে চলে গেল।

তারপর থেকে ব্রাহ্মণীর ছেলে-বৌ সব দিনের জন্যে একভাবে লক্ষ্মী পুজো করতে লাগল, তারা লক্ষ্মীর মাহাত্ম্যের কথা চারিদিকে প্রচার করে দিল।

ব্রতের ফল-

খুব নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে লক্ষ্মীপুজো করলে, মা লক্ষ্মী চিরদিন সংসারে বাঁধা থাকেন। তার সংসারে আর কোন অভাব থাকে না।

লক্ষ্মীপূজা ব্রত সম্পর্কিত কিছু টি প্রশ্ন উত্তর


1. লক্ষ্মীপূজা ব্রত কি?

উত্তর: লক্ষ্মীপূজা ব্রত হলো একটি হিন্দু ধর্মীয় ব্রত, যা দেবী লক্ষ্মীর প্রতি ভক্তি এবং আশীর্বাদের অপরাধক উদ্দীপনে অনুষ্ঠিত হয়।


2. লক্ষ্মীপূজা ব্রতের উদ্দীপন হওয়ার পূর্বে কী অনুষ্ঠান হয়?

উত্তর: লক্ষ্মীপূজা ব্রতের উদ্দীপন হওয়ার আগে ব্রত নিয়ে বিশেষ পূজা ও আচরণ অনুষ্ঠিত হয়, এবং ব্রতপতি একটি বিশেষ ধারাবাহিক প্রস্তুত করে নেয়।


3. লক্ষ্মীপূজা ব্রতের সময় কোন অনুষ্ঠান করা হয়?

উত্তর: লক্ষ্মীপূজা ব্রত সাধারিত রূপে পৌষ মাসে অনুষ্ঠিত হয়, তবে কিছু পৌরাণিক ব্রত এটি কার্তিক মাসে অনুষ্ঠিত করা হতে পারে।


4. ব্রতে কোন প্রকার অপহারণ এবং নৈবেদ্য অনুষ্ঠিত হয়?

উত্তর: লক্ষ্মীপূজা ব্রতে ফল, নারীলেবু, মিষ্টি, নৈবেদ্য, দীপ, ফুল, তৈল এবং ধূপের মধ্যে অপহারণ এবং নৈবেদ্য অনুষ্ঠিত হয়।


5. ব্রত পালনের সময় কি কি নিয়ম মেনে চলতে হয়?

উত্তর: ব্রত পালনের সময় কোনো পুরোহিতের সাথে সহযোগিতা করা জরুরি, এবং বিশেষভাবে উপস্থিতির সময় ভক্তি ও মানসিক সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


6. ব্রতে কি ধরণের পূজা অনুষ্ঠিত হয়?

উত্তর: লক্ষ্মীপূজা ব্রতে ধারাবাহিক ভাবে পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং বিশেষভাবে দেবী লক্ষ্মীর প্রতি ধ্যান এবং পূজা করা হয়।


7. ব্রতের দিনে কোন বিশেষ আহার অনুষ্ঠিত হয়?

উত্তর: ব্রতের দিনে ভক্তরা শাকসবজি, ফল, মিষ্টি, দোহি বা দুধের উপাদানে পরিচ্ছন্ন ভাবে আহার নেয়।


8. ব্রতের পর কী অবস্থা অনুভব হয়?

উত্তর: ব্রত পূর্ণ হলে ভক্তরা অবস্থানের জন্য দেবী লক্ষ্মীকে প্রদর্শন করে এবং প্রদান করা অফৎ বা প্রদান করা সামগ্রী নিয়ে আবার অপর ক্ষেত্রে গিয়ে প্রদান করা হয়।


9. লক্ষ্মীপূজা ব্রতে কোন ধার্মিক গ্রন্থ অনুসরণ করা হয়?

উত্তর: ব্রতে গুণ্ঠিত হয় বা পঠিত হয় ধার্মিক গ্রন্থের মধ্যে, যেমন লক্ষ্মী সহস্ত্রনাম, লক্ষ্মী পুরাণ, ও লক্ষ্মী তন্ত্র।


10. ব্রতের পর কী করতে হয়?

উত্তর: ব্রত পূর্ণ হলে ভক্তরা দেবীকে আরও পূজা দিয়ে আবেগ, ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। পরে ভক্তরা বিশেষ ধরণের পুজা করে এবং লক্ষ্মীপূজা ব্রতের উপাস্য মূর্তি কিংবা চিহ্নের দিকে আবৃত্তি করে।

You May Like Also Also Like This

Post a Comment

0 Comments


Advertisement