-->

শনিদেবের ব্রতকথা - Shani Dev Brata Katha in Bengali

 শনিদেবের ব্রতকথাঃ শনি নবগ্রহের একটি অন্যতম গ্রহ, শনি গ্রহকে গ্রহরাজ-ও বলা হয়ে থাকে। শনি হিন্দুধর্ম মতে একজন দেবতা। শনি উগ্র দেবতা হিসেবে পরিচিত । জ্যোতিষীদের মতে শনির বক্রদৃষ্টির ফলে যে ভালো কাজ করে তার ভালো হয় আর সে মন্দ কাজ করে তাদের সেরূপ শাস্তি হয়। শনি গ্রহ ও সপ্তাহের শনিবা দিনটি শনিদেবের নামে নামকরণ করা হয়। শনিদেব কে শনিশ্চর বা শনৈশ্চর(যিনি আস্তে চলেন) নামেও ডাকা হয়।

শনিদেবের ব্রতকথা

ব্রতের নিয়মঃ-শনিবার সন্ধ্যাকালে ঘরের বাহিরে উঠানে এই ব্রত করিতে হয়। ইহাতে সত্যনারায়ণ পূজার ন্যায় সিন্নি দেওয়া হয়। সারাদিন উপবাসী থাকিয়া সন্ধ্যায় শনিদেবের পূজার শেষে ব্রতকথা শুনিয়া নির্মাল্য প্রসাদ গ্রহণ করিবেন।

ব্রতের উপকরণঃ- উৎকৃষ্ট ফল ৫টি, পান, সুপারী, কালােপাড় ধুতি, লােহার আসনাঙ্গুরীয়, মধুপর্কের বাটি, মাফকলাই, কালাে তিল, নীল অপরাজিতা ফুল, নৈবেদ্য, মিষ্টান্ন, ধুপ-দীপ, সিন্নির জন্য-আটা, দুদ্ধ, গুড়, কলা, বাতাসা, কালাে মাটির ঘট বা লােহার ঘট, পুষ্প, গঙ্গাজল ও গঙ্গামুক্তিকা ইত্যাদি।

ব্রতের ফলঃ—এই ব্রত করিলে শনিদেব সুপ্রসন্ন হন। সংসারে আপদ-বিপদ, দুঃখ-কষ্ট দূর হইয়া সংসার শান্তিময় হয়। শনিদেবের কৃপায় সর্বপ্রকার গ্রহদোষ কাটিয়া যায়। 


পূজাবিধিঃ- আচমনাদি সমাপন করিয়া স্বস্তি বাচন ও সঙ্কল্প করিয়া গণেশাদি পঞ্চদেবতার পূজান্তে যথাবিধি ঘটস্থাপনাদি করিয়া শনিদেবের ধ্যানাস্তে যথাশক্তি উপচারে পূজা করিবেন।

ধ্যানঃ— ওঁ সৌরাষ্টং কাশ্যপং শূদ্রং সূর্যাস্যং চতুরঙ্গুল। কৃষ্ণং কৃষ্ণান্থরং গুগতং সৌরিং চতুর্ভুজ। উদ্ববাণংশূল ধনুহস্তং সমাহয়েৎ। যমাধিদৈবতং দেবং প্রজাপতি প্রত্যধিদৈবতম্। 

পূজামন্ত্র: —ওঁ ঐং হং শ্রীং শনৈশ্চরায় নমঃ। 

প্রণাম মন্ত্র—ওঁ নীলাঞ্জনচয়ং প্রখ্যং রবিসূতং মহাগ্রহম। ছায়ায়া গর্ভসম্ূতং বন্দে ভক্ত্যা শনৈশ্চর। অতঃপর নবগ্রহ, দশদিকপাল, ছায়া, সবণা, কালী, শিব, যম ও প্রজাপতির পূজা করিয়া পরে শনির পঞ্চোপচারে পূজা করিবেন। শেষেও গৃপ্রায় নমঃ মন্ত্রে গৃপ্রের পূজা করিবেন। ব্রতকথা—শ্রীহরি নামেতে এক ছিল যে ব্রাহ্মণ। নিত্য ভিক্ষা করি উদর পুরণ।। দিবা রাত্র কৃষ্ণনাম জপে অকপটে। অন্তরে সদাই সুখী অন্ন নাহি পেটে৷৷ হেনকালে তার এক পুত্র জনমিল। পূত্র মুখ দেখি দ্বিজ বিবাদে ভাসিল।। ভিক্ষা করি দ্বিজসেবা পুত্র রক্ষা করে। সুমঙ্গল বলি নাম রাখিল পুত্রেরে।। অত্যন্ত মেধাবী পুত্র সবে গুণ গায়। অল্পদিন মধ্যে শিশু শিখে সমুদয়।। শাস্ত্র আলােচনা করি শাস্ত্রজ্ঞ হইল। পণ্ডিত বলিয়া তারে সকলে জানিল।। মনে মনে সুনঙ্গল হরিকে ডাকিল। গৃহ ছাড়ি নানা তীর্থে ঘুরিতে লাগিল।। আচম্বিতে এক স্থানে করিল শ্রবণ। পিতা-মাতা পরলােকে করেছে গমন। শুনি তাহা গয়াধামে করিয়া গমন। বিষ্ণুপাদ-পদ্মে শিশু করিল অর্পণকালবশে ঘটে যাহা কে করে খণ্ডন। শনির দৃষ্টিতে পড়ে দ্বিজের নন্দন।ভ্রমিতে ভ্রমিতে দ্বিজ যায় বহুদুরে। শেষে উপস্থিত হয় বিদর্ভ নগরে।রাজার সভায় দ্বিজ উপস্থিত হৈল ব্রাহ্মণ দেখিয়া রাজা অভ্যর্থনা লৈ৷ রাজার নিকটে দ্বিজ দেয় পরিচয়। সুমঙ্গল নাম মের ওহে মহাশয়।৷ অতি দুঃখী হই আমি নাহি পিতা-মাতা। নানা দেশ ভ্রমি আমি থাকি যথা তথা।॥ শ্রীবৎস রাজন বলে, চিন্তা দুর কর। আমার আশ্রয়ে থাকি মােরে কৃপা কর। শাস্ত্রজ্ পণ্ডিত তুমি বুঝি অনুমানে। শাস্ত্রপাঠে তুষ্ট কর সভাসদগাণে। দুই পুত্র আছে মাের শুন হৈব্রাহ্মণ। পড়াইব তব কাছে করিয়াছি মন।।রাজার বাক্যেতে দ্বিজসম্ভুট হইল। রাজার আশ্রয়ে বাস করিতে লাগিল।। দুই রাজপুত্রে দ্বিজ অতি যত্ন করে। নিত্যই পড়ায় দ্বিজ রাজার কুমারে।। এইরূপে কিছুদিন বিশ্বত হইল। পড়ুয়া বেশেতে শনি উপস্থিত হইল। শনিরে জিজ্ঞাসে দ্বিজ, শুন বাছাধন। কিবা হেতু হেথা তব হয় আগমন।। শনি বলে, এন শাস্ত্র অধ্যয়ন তরে। দ্বিজ বলে, যত করি পড়াব তােমারে। অল্পদিন মধ্যে শনি সুপণ্ডিত হৈল। সুমঙ্গল পরিচয় জানিতে চাহিল।। শনি বলে, পরিচয় কিবা দিব আর। শনৈশ্চর নাম মাের সূর্যের কুমার।।সুমঙ্গল বলে যদি দেখা দিলে মােরে। কিসে দুঃখ দূরে যাবে বল হে আমারে।। আমার উপরে আছে তােমার কটাক্ষ। কিসে যাবে বল প্রভু হইয়া স্বপক্ষ৷শনি বলে, ভােগকাল ছয়মাস আছে। দশদণ্ড মধ্যে যাবে না আসিবে কাছে।। সপ্তম দিবসে গিয়া ভগীরথী তীরে।

Read Also: Latest Happy Diwali Wishes, Greeting & SMS, Dipabali Whatsapp Status

 একান্ত মনেতে দ্বিজ ভজ মুরারীরে।। এত বলি শনিদেব অন্তর্ধান হৈল। সুমঙ্গল আর তার দেখা না পাইল। শনি আজ্ঞামত দ্বিজ গিয়া গঙ্গাতীরে। নারায়ণে ভজে দ্বিজ একান্ত অন্তরে।। দশদণ্ড পূর্ণ হৈল মনেতে বিচারি। উঠি দাঁড়াইল দ্বিজ বলিয়া শ্রীহরি। কিন্তু দশদণ্ড পূর্ণ না হয় তখন তার পূর্বে চলে আসে আপন ভবন।। তাহা দেখি শনিদেব কৃপিত হইল। দুই রাজপুত্রে শনি হরণ করিল৷ পুনঃ মায়া বলে দুই শিশু মুণ্ড গড়ি। দ্বিজের নিকটে শনি যান তাড়াতাড়ি।। হেথা দ্বিজ চক্ষু বুজি শ্রীহরিরে স্মরে।মুণ্ড দুটি ফেলে তার উরুর উপরে। হেথা নিদ্রা যােগে রাজা দুঃস্বপ্ন দেখিল। পাত্রমিত্র। গঙ্গাতীরে গেল। দেখিয়া দ্বিজের কোলে পুত্র মুণ্ডদ্বয়। হাহাকার করি রাজা ধুলায় লুটায়।॥ রাজাদেশে দূতগণ বাঁধে ব্ৰণেরে। শৃঙ্খলে বন্ধন করি রাখে কারাগারে।। কারাগারে বসি দ্বিজ কাদিতে লাগিল। বিপদহস্তা মধুসুদনে স্মরিতে লাগিল। অতঃপর ঘটে এক বিচিত্র ঘটন। দশদণ্ড বেলা পূর্ণ হইল যখন। শােকেতে কাতর রাজা ছিলেন যেখানে। হেনকালে দুই পুত্র আসিল সেখানে।।রাজা বালে, কোথা ছিলে হৃদয়ের ধন। শয্যা পরে ছিনু পিতা করিয়া শয়ন। পুত্রদের বাক্যে রাজা আশ্চর্য হইল। আদ্য অন্ত কিছু তার বুঝিতে নারিল।। ব্রাহ্মণের কথা এবে পড়ে গেল মনে। না বুঝিয়া কত কষ্ট দিনু সে ব্রাহ্মণে৷৷ রাজাদেশে দূত গিয়া আনিল বিপ্রেরে। জীর্ণ শীর্ণ কলেবর কাদেন কাতরে।। বিনয় বচনে রাজা করে তার স্তুতি। সব অপরাধ ক্ষমা কর মহামতি। কৃপা করি কর মাের সন্দহ ভঞ্জন। তব ক্রোড়ে কার মুণ্ড করেছি দর্শন।। দ্বিজ বলে, মহারাজ কিছুই না জানি। শনি কোপে কষ্ট পাই এইমাত্র মানি।রাজা বলে, যদি পাই শনি-দরশন। সােড়শােপচারে তার করিব পূজন।। নৃপবাক্য শুনি দ্বিজ করিল গমন। শনির নিকটে সব করে নিবেন। শুনিয়া সকল কথা শনিদেব এল। শনিদেবে দেখি রাজা প্রণাম করিল। রাজা বলে যদি প্রভু এলে কৃপা করে। পূজার বিধান তবে বল প্রভু মােরে। শনি বলে, পূজাবিধি শুনহে রাজন। যেরূপে করিবে মাের পূজা আয়ােজন। শুদ্ধভাবে শুদ্ধমনে আমার বারেতে। করিবে আমার পূজা একান্ত মনেতে। নীলবস্ত্র কৃষ্ণতিল আর তৈল দিবে। মাষকলাই আর মােষ সংগ্রহ করিবে। কৃষ্ণবর্ণ ঘট এক করিয়া স্থাপন। পঞ্চজাতি ফল-ফুলে করিবে অর্চন।। এই মাের পূজাবিধি কহিলাম সার। ভক্তিই প্রধান জেনাে কি কহিব আর।। পূজা-শেষে ভক্তিভরে করিবে প্রণাম। নবগ্রহ স্তোত্র পাঠে লইবেক নাম। আমার প্রসাদ খাবে করিয়া যতন। সর্বপাপ দূরে যাবে আমার বচন। অভক্তি করিয়া যেবা প্রসাদ খাইবে। অল্পদিনে শমনের ভবনে সে যাবে। আমার পূজায় যেবা করে অনাদর। চিরকাল দুঃখ পেয়ে হইবে কাতর। এত বলি শনিদেব হন অদর্শন। ভক্তিভরে করে রাজা শনির পূজন। প্রতি শনিবারে পূজা করে নৃপবর। বিপ্রগণে দান দিয়া তুষিল বিস্তর।। নৃপ-পাশে সুমঙ্গল বিদায় লইয়া। শনিদেবে পূজা করে গঙ্গাতীরে গিয়া।। এইরূপে পূজা প্রচারিল শনিদেবে। যাহার যেমন সাধ্য সে ভাবে পূজিবে।। শনির মাহাত্ম্য যত কে বর্ণিতে পারে। কিঞ্চিৎ রচিত হৈল শনিদেবের বরে।। সর্বদা শনির পদ থাকে যার মনে। উদ্ধারে বিপদ হতে পড়িলে শমনে। শনির পাঁচালী যেবা রাখিবে ভবনে। কখনও না পড়ে সে বিপদ বন্ধনে।। শনি প্রণমিয়া যেবা নিজ কার্য্যে যায়। সমাদর করে তারে রাজার সভায়। স্কন্দ পুরাণের কথা অন্যথা না হয়। যথাবিধি ব্যাসবাক্য কভু মিথ্যা নয়।। শুদ্ধাশুদ্ধ জ্ঞানহীন বলে নিবারণ। ভূমিতে লুটিয়া বন্দি শনির চরণ।। এতদূরে এই গ্রন্থ সমাপন করি। শনৈশ্চর প্রীতে সবে বল হরি হরি।।

- সমাপ্ত -


You May Like Also Also Like This

Post a comment

0 Comments